বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন

প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং বাড়ছে

নিজস্ব প্রতিবেদক | ব্যাংক-বীমা
ডিসেম্বর ২৮, ২০২৫
প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর ইসলামী ব্যাংকিং বাড়ছে
বাংলাদেশ ব্যাংক

দেশের পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানতে ধীরগতি থাকলেও প্রচলিত ধারার ব্যাংকের ইসলামী ব্যাংকিং কার্যক্রম দ্রুত বাড়ছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর মোট  ইসলামী ব্যাংকিং আমানত ৪১ শতাংশ বেড়ে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকা হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত যেখানে বেড়েছে ৪ শতাংশের কম। একইভাবে সার্বিকভাবে ইসলামী ব্যাংকগুলোর তুলনায় প্রচলিত ধারার ব্যাংকগুলোর শরিয়াহভিত্তিক ঋণ বা বিনিয়োগ বেশি হারে বেড়েছে। ইসলামী ব্যাংকিং নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গত অক্টোবরভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

আমানতকারীদের অর্থ ফেরত দিতে না পারায় ইসলামী শরিয়াহভিত্তিক পরিচালিত এক্সিম, সোস্যাল ইসলামী, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী, গ্লোবাল ইসলামী ও ইউনিয়ন ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে। এতে করে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের সংখ্যা ১০টি থেকে কমে ছয়টিতে নামছে। আর মোট ব্যাংকের সংখ্যা কমে দাঁড়াচ্ছে ৫৭টিতে। ৩৫ হাজার কোটি টাকার পরিশোধিত মূলধন নিয়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক যাত্রা শুরু করছে। এসব ব্যাংকের প্রায় ৭৬ লাখ আমানতকারীকে ব্যাংকগুলোর চাঁদায় গড়ে ওঠা আমানত বীমা ট্রাস্ট তহবিল থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হবে। এ জন্য এখান থেকে ১২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের অ্যাকাউন্ট নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকে স্থানান্তরের প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন হলে বিদ্যমান পাঁচ ব্যাংকের আমানত নবগঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের হিসাবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্থানান্তরিত হবে। এরপর আমানতকারীরা তাদের বিদ্যমান চেক বইয়ের মাধ্যমে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত উত্তোলন করতে পারবেন। অবশিষ্ট আমানত (যদি থাকে) তাদের ব্যাংক হিসাবে সুরক্ষিত থাকবে এবং আমানতের ওপর প্রচলিত হারে মুনাফা দেওয়া হবে। তিনি বলেন, নবগঠিত ব্যাংকটি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন হওয়ায় জনগণের আস্থা সৃষ্টি হবে এবং আমানতকারীদের টাকা তোলার চাহিদা অনেকাংশে কমে আসবে বলে আশা করা যায়।

দেশে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর শাখা রয়েছে এক হাজার ৬৯৯টি। এর মধ্যে একীভূত হয়ে গঠিত সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের শাখা ৭৬১টি। ব্যাংকগুলো একীভূত হলেও কোনো শাখা আপাতত বন্ধ হবে না। তবে একই এলাকায় যেখানে একাধিক শাখা রয়েছে, সেখান থেকে আরেক জায়গায় স্থানান্তর হবে। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের বাইরে প্রচলিত ধারার ১৭টি ব্যাংকের ৪১টি ইসলামী ব্যাংকিং শাখা এবং ৩৩৪টি উইন্ডো রয়েছে। এর বাইরে প্রচলিত ধারার ১২টি ব্যাংকের ৫৮৫টি ইসলামী ব্যাংকিং উইন্ডো রয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রচলিত ধারার ইসলামী ব্যাংকের আমানত ৪১ দশমিক ৪৭ শতাংশ বেড়ে ৬৫ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা হয়েছে। এক বছর আগে তাদের আমানত ছিল ৪৬ হাজার ৬২২ কোটি টাকা। এ সময়ে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত মাত্র ৩ দশমিক ৯২ শতাংশ বেড়ে চার লাখ এক হাজার ৪৭৩ কোটি টাকা হয়েছে। সব মিলিয়ে গত অক্টোবরে ইসলামী ব্যাংকিংয়ে আমানত ৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ বেড়ে চার লাখ ৬৭ হাজার ৪২৯ কোটি টাকা হয়েছে। গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে যেখানে ব্যাংক খাতের মোট আমানত ১০ দশমিক ৪৯ শতাংশ বেড়ে ২০ লাখ ৭১ হাজার ৭০ কোটি টাকা হয়েছে। আর মোট আমানতে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের অংশ কমে ২২ দশমিক ৫৭ শতাংশে নেমেছে। গত বছরের অক্টোবর শেষে ব্যাংক খাতের মোট ১৮ লাখ ৭৪ হাজার ৩৮৮ কোটি টাকা আমানতের মধ্যে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ছিল চার লাখ ৩২ হাজার ৯৩৭ কোটি টাকা। মোট আমানতে যা ছিল ২৩ দশমিক ১০ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ বা ঋণ গত অক্টোবর পর্যন্ত এক বছরে ১১ দশমিক ২৭ শতাংশ বেড়ে পাঁচ লাখ ৭৬ হাজার ৮৬৪ কোটি টাকা হয়েছে। এর মধ্যে প্রচলিত ধারার ইসলামী ব্যাংকিং ঋণ ৩৫ দশমিক ২৪ শতাংশ বেড়ে ৫১ হাজার ৩১ কোটি টাকা হয়েছে। মূলত খারাপ অবস্থায় পড়া ব্যাংকের ঋণের বড় অংশই খেলাপি হয়ে পড়ায় কোনো আদায় নেই। যে কারণে সামগ্রিকভাবে এসব ব্যাংকের ঋণ তেমন কমছে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বেশ কয়েকটি ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার চরম অবনতির কারণে ২০২২ সাল থেকে তাদের আমানত ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। তবে গত কয়েক মাসে আস্থা কিছুটা ফিরতে শুরু করেছে। যে কারণে সার্বিকভাবে পূর্ণাঙ্গ ইসলামী ব্যাংকের আমানত সামান্য হলেও বেড়েছে। যদিও মোট আমানতে তাদের অংশ কমেছে। এর বাইরে একীভূত হতে যাওয়া ব্যাংক থেকে দীর্ঘদিন ধরে মানুষ কোনো টাকা তুলতে পারছে না। যে কারণে আগের মতো আমানত কমছে না। মূলত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় কয়েকটি ইসলামী ব্যাংকের জালিয়াতির তথ্য সামনে আসার পর আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই তখন আমানত তুলে নিতে শুরু করেন। ২০২২ সালের জুনে ইসলামী ব্যাংকগুলোর আমানত ছিল চার লাখ এক হাজার ৩০২ কোটি টাকা। ব্যাংক খাতে মোট আমানত ছিল ১৬ লাখ ২৪ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকার, যা ছিল ২৪ দশমিক ৭০ শতাংশ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা বলেন, ২০১৭ সালে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড দখলের আগ পর্যন্ত বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণের পরও ইসলামী ব্যাংকগুলোর হাতে প্রচুর উদ্বৃত্ত অর্থ থাকত। ওই সময় এমনও হতো, অনেক সময় মোট উদ্বৃত্ত তহবিলের ৮০ শতাংশের মতো থাকত এসব ব্যাংকের।  ইসলামী ব্যাংকগুলো যেহেতু প্রচলিত ধারার বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করতে পারে না বলেই এমন হতো। এ কারণে সুকুক বা শরিয়াহভিত্তিক বন্ডের প্রচলন বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় সরকার। তবে ২০২২ সালে এসব ব্যাংকের জালিয়াতি সামনে আসার পর ধারাবাহিকভাবে আমানত কমেছে। তবে ঋণের বড় অংশই বেনামি হওয়ায় তা আর আদায় হচ্ছে না। যে কারণে অনেক ব্যাংক এখন জমানো টাকা ফেরত দিতে পারছে না।

 

ব্যাংক-বীমা'র অন্যান্য খবর

সর্বশেষ