আগের বছরগুলোর মতোই, রংপুর কৃষি অঞ্চলের নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষ তাদের ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় নতুন স্বপ্ন নিয়ে আন্তঃফসল পদ্ধতিতে শীতকালীন বিভিন্ন ফসল চাষাবাদ শুরু করেছেন।
বিশেষজ্ঞ, স্থানীয় বাসিন্দা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, বন্যার সময় পলি জমে নতুন করে জেগে ওঠা চর এবং শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশে মানুষ এখন চাষাবাদের জন্য জমি প্রস্তুত শুরু করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, রংপুর অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো. সাইফুল ইসলাম বাসসকে জানান, এই অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় নদ-নদী বেষ্টিত চরাঞ্চলের মানুষ ৮২ হাজার হেক্টরেরও বেশি বালুকাময় জমিতে প্রতি বছর বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করছেন।
সাম্প্রতিব বছরগুলোতে রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার ৮২ হাজার হেক্টর চরাঞ্চলের জমি থেকে প্রতি বছর প্রায় ৬ লাখ টন ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। কৃষক পর্যায়ে এর বাজারমূল্য প্রায় ১ হাজার ২০০ কোটি টাকা।
তিনি বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব ও তীব্র আঘাত সত্ত্বেও, চরাঞ্চলে প্রচুর পরিমাণে বিভিন্ন ধরনের বিষমুক্ত শীতকালীন ফসল উৎপাদনের ফলে স্থানীয় অর্থনীতি সচল রয়েছে এবং মানুষের জীবনযাত্রার মানেরও কার্যকর উন্নতি হয়েছে।’
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর, ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, ঘাঘট, যমুনা, করতোয়াসহ এই অঞ্চলের অন্যান্য নদ-নদীর তীরবর্তী এলাকা, বালুচর এবং পলিযুক্ত নদীর তলদেশে কৃষকরা এখন ফসল বোনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
নদীর চর ও নদীতীরে বসবাসকারী ভূমিহীন, দরিদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকরা সাধারণত প্রতি বছর এসব জমিতে আলু, স্কোয়াশ, কুমড়া, শসা, বেগুন, কাঁচা মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, ভুট্টা, চিনাবাদাম, তিল, তামাক, কলা, বিভিন্ন ধরনের ডাল ও তরমুজসহ নানা ধরনের ফসল চাষ করে থাকেন।
সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘এসব বালুকাময় জমিতে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই তারা শীতকালীন ফসলের বীজ বপন শুরু করবেন। ডিসেম্বরের শেষ নাগাদ ফসল তোলার কাজ শুরু হবে এবং বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই, অর্থাৎ আগামী বছরের মে মাসের মধ্যে পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন হবে।’
নদীর চর ও নদীতীরে বসবাসকারী শত-শত মানুষ, যারা প্রতি বছর বন্যার ঝুঁকির মুখে থাকেন, তারা সম্মিলিত প্রচেষ্টায় এসব এলাকায় সফলভাবে শীতকালীন ফসল চাষ করছেন।
তারা নদীর চর এবং শুকিয়ে যাওয়া নদীর তলদেশ—উভয় জায়গাই চাষাবাদের জন্য ব্যবহার করছেন।
ইন্টারন্যাশনাল মেজ অ্যান্ড হুইট ইমপ্রুভমেন্ট সেন্টার, বাংলাদেশ-এর ‘রূপান্তর’ প্রকল্পের পরামর্শক কৃষিবিদ ড. মো. মামুনুর রশীদ জানান, চরাঞ্চলে ফসল চাষ এখন অত্যন্ত লাভজনক একটি উদ্যোগে পরিণত হয়েছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবের মধ্যেও সেখানে বসবাসকারী অনেক মানুষের জীবনে এটি সমৃদ্ধি বয়ে এনেছে।
রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচটি জেলায় শত-শত চরগ্রাম ও নদীতীরে বসবাসকারী হাজার-হাজার মানুষ এখন এসব জমিতে বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন ফসল ফলাচ্ছেন; বিশেষ করে তারা ‘আন্তঃফসল’ পদ্ধতি ব্যবহার করছেন।
তিনি বলেন, ‘ব্রহ্মপুত্র, ধরলা, তিস্তা ও অন্যান্য নদীর বালুকাময় চর এবং শুকিয়ে যাওয়া তলদেশে স্থানীয় বাসিন্দারা আলু, কুমড়া, পেঁয়াজ, রসুন, কাঁচা মরিচ, সরিষা, ডাল এবং বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন শাকসবজি চাষ করছেন।’
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাধ্যমে সরকারি সহায়তা পেয়ে অনেক চরাঞ্চলবাসী পরিবার বিভিন্ন ফসল চাষের মাধ্যমে স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছেন।
তিনি বলেন, ‘সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি তাদের জীবনযাত্রার মান ও জীবিকায় ইতিবাচক পরিবর্তন এনেছে।’
রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার চর মহিপুর গ্রামের নূর ইসলাম, গোলাম মোস্তফা, কবিজা খাতুন ও মোরশেদা বেগম বাসস-কে জানান, তারা তিস্তা নদীর অববাহিকায় অবস্থিত চরের জমিতে শীতকালীন ফসলের বীজ বপনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার চর তালুক শাহবাজ গ্রামের বকতার আলী ও মোমেনা বেগম এবং ঢুষমারা চরের আব্দুল মালেক জানান- গতবছর ভালো মুনাফা অর্জনের পর, তারা আবারও চরাঞ্চলে মিষ্টি কুমড়োর বীজ রোপণ করছেন।
একইভাবে, কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার চর ডেবরিখোলা জানকারচৈড় গ্রামের আবু সাদ্দাম, আব্দুল হামিদ ও সাজেদুল ইসলাম জানান, তারা এই মৌসুমে শীতকালীন বিভিন্ন ফসলের বীজ বপনের জন্য তাদের চরের জমি প্রস্তুত করেছেন।
পূর্ববর্তী বছরগুলোর মতোই, এবারও তারা বাম্পার ফলনের আশা করছেন।